প্রাকৃভাষণ | বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন | ড. অতুল সুর

প্রাকৃভাষণ | বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন | ড. অতুল সুর : বাঙালী এক প্রতিভাশালী জাতি। তার প্রতিভা বিকশিত হয়েছিল তার ধর্মীয় চিন্তাধারা, জাতিবিন্যাস, সমাজগঠন ও সংস্কৃতির স্বকীয়তায়। নৃতাত্ত্বিক গঠনের দিক দিয়ে এই প্রতিভাবান জাতি সমগ্র উত্তরভারতের জাতিসমূহ থেকে পৃথক। উত্তরভারতের জাতিসমূহের মধ্যে আগন্তুক আর্যভাষাভাষী ‘নর্ডিক’ নরগোষ্ঠীর লক্ষণযুক্ত উপাদানেরই প্রাধান্য লক্ষিত হয়। এই উপাদান পূর্বদিকে বারাণসী পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়ে ক্রমশ ক্ষীয়মাণ ও বিলীন হয়ে গিয়েছে। এর পূর্বদিকে আমরা যে নৃতাত্ত্বিক উপাদান লক্ষ্য করি তা ক্রমশ বর্ধমান হয়ে বাঙলাদেশে এসে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

প্রাকৃভাষণ | বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন | ড. অতুল সুর

এক কথায় এই উপাদানের আবাসস্থান হচ্ছে বাঙলাদেশ। এই নৃতাত্ত্বিক উপাদানে যাদের দেহ গঠিত, তারাই হচ্ছে বাঙালী জাতি। এরাও আর্যভাষাভাষী আর এক নরগোষ্ঠীর বংশধর। নৃতত্ত্বের ভাষায় এদের আপীয়, দিনারিক, আর মেনয়েড ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। এরা পঞ্চনদের উপত্যকায় আগত নর্ডিক নৃতাত্ত্বিক উপাদানে গঠিত ঋগ্বেদ রচয়িতা আর্যভাষাভাষী জাতি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এরা ঋগ্বেদ রচয়িতা আর্যগণের পঞ্চনদের উপত্যকায় আসবার অনেক পূর্বেই বাঙলাদেশে এসে বসবাস শুরু করেছিল। এদের ধর্ম, জাতিবিন্যাস, সমাজ ও সংস্কৃতি পঞ্চনদের উপত্যকায় বসবাসকারী আর্যগণের ধর্ম, বর্ণবিন্যাস, সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল।

এদের ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি পৃথক ছিল বলেই পঞ্চনদের আর্যগণ এদের ঈর্ষা ও ঘৃণার চক্ষে দেখত। বৈদিক সাহিত্যে এর প্রমাণের অভাব নেই। অথচ এদের ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে আর্যদের কৌতূহলও কম ছিল না। এটা আমরা বৌধায়ন ধর্মসূত্র থেকে জানতে পারি। বৌধায়ন ধর্মসূত্রে বলা হয়েছে যে বাঙলাদেশ বৈদিক আর্য-সংস্কৃতির লীলাক্ষেত্র আর্যাবর্তের বাইরের দেশ। অথচ বাঙলাদেশের তীর্থস্থানগুলি এমনই মহিমান্বিত ছিল যে বৈদিক আর্যসমাজগোষ্ঠীর উদার মনোভাবাপন্ন লোকেরা সেসব তীর্থে পুণ্য অর্জন করতে আসতেন। কিন্তু এরূপ উদারমনোভাবাপন্ন লোকদের আর্য সমাজ ভাল চোখে দেখতেন না। সেজন্যই আমরা বৌধায়ন ধর্মসূত্রে এরূপ উদারমনোভাবাপন্ন বৈদিক আর্যতীর্থযাত্রীর দল যারা বাঙলাদেশে আসতেন, তাঁদের জন্য প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থার বিধান দেখি।

[ প্রাকৃভাষণ | বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন | ড. অতুল সুর ]

বাঙলায় বসবাসকারী ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোত্রীয় আর্যভাষাভাষীদের এক ঐতিহ্য মণ্ডিত সংস্কৃতি ছিল। তারা নিজেদের সংস্কৃতিকে বৈদিক আর্যসংস্কৃতি থেকে অনেক শ্রেষ্ঠ মনে করত। সেজন্য বৈদিক সংস্কৃতি যখন পূর্বদিকে তার জয়যাত্রা শুরু করেছিল, তখন প্রাচ্যদেশের প্রত্যন্তসীমায় এসে, তাদের প্রাচাদেশের আর্য ভাষাভাষী লোকদের কাছে প্রচণ্ড প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ভারতে আগমনের দেড় হাজার বৎসর পর পর্যন্ত, বৈদিক আর্যরা বাঙলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি। কিন্তু পরে যখন প্রবেশ করেছিল, তখন বৈদিক আর্যসমাজকে নতিস্বীকার করতে হয়েছিল প্রাচ্যদেশের কাছে। প্রাচ্যদেশে গুপ্তবংশীয় সম্রাট গণের আমলেই এটা ঘটেছিল। তখন আর্যসমাজকে ভুলে যেতে হয়েছিল ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি প্রভৃতি বৈদিক দেবতাগণের উদ্দেশ্যে স্তুতিগান করা। তার পরিবর্তে তারা পূজা করতে আরম্ভ করেছিল পৌরাণিক দেব-দেবীসমূহকে। তাদের বৈদিক গরিমা ক্রমশ স্নান হয়ে গিয়েছিল।

বৈদিক আর্যভাষারও রূপান্তর ঘটেছিল। বাঙলার কবিরা সংস্কৃত ভাষায় যে সব কাব্য রচনা করতে শুরু করেছিল, তার অভিনব উৎকর্ষের জন্য, তা ‘গৌড়ীয় রীতি’ নামে এক বিশিষ্ট আখ্যা অর্জন করেছিল। এই রীতিতেই রচনা করে ছিলেন বাঙলার অমর কবি জয়দেব তাঁর ‘গীতগোবিন্দ’ যার সমতুল কাব্য-গ্রন্থ বিশ্বসাহিত্যে দুর্লভ।

মহাস্থান প্রত্নস্থলের একাংশ, বগুড়া
মহাস্থান প্রত্নস্থলের একাংশ, বগুড়া

 

বাঙালী আত্মবিশ্বত জাতি। সে ভুলে গিয়েছিল তার প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। সেজন্যই একশ বছর পূর্বে বঙ্কিম আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে বাঙালীর ইতিহাস নেই। আজ কিন্তু আর সেকথা বলা চলে না। নানা সুধীজনের প্রয়াসের ফলে আজ বাঙলার ও বাঙালীর এক গৌরবময় ইতিহাস রচিত হয়েছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক প্রচেষ্টা ছিল রাজশাহীর বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটির। বর্তমান শতাব্দীর স্বচনায় (১৯১২) ওই সোসাইটির পক্ষ থেকে রমাপ্রসাদ চন্দ লেখেন ‘গৌড়রাজমালা’ ও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় প্রকাশ করেন ‘গৌড়লেখমালা’। তারপর রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা করেন তাঁর ‘বাঙলার ইতিহাস’। কিন্তু রাখালদাসের বইখানা ছিল রাষ্ট্রীয় ইতিহাস, বাঙালীর জীবনচর্যার ইতিহাস নয়।

তিনের দশকে বাঙলার ইতিহাসের একটা কঙ্কাল ধারাবাহিক ভাবে উপস্থাপিত করেন বর্তমান লেখক ‘মহাবোধি সোসাইটি’র মুখপত্র ‘মহাবোধি’তে। চল্লিশের দশকের গোড়াতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বের করে তাদের ‘হিস্ট্রি অভ্ বেঙ্গল’। এই বইটাতেই প্রথম প্রদত্ত হয় বাঙালীর জীবনচর্যার বিভিন্ন বিভাগের ইতিহাস। এর ছ’বছর পরে ডঃ নীহাররঞ্জন রায় অসামান্য গৌরব অর্জন করলেন বাংলা সাহিত্যের অনবদ্য সৃজন তাঁর ‘বাঙালীর ইতিহাস — আদিপর্ব’ লিখে। কিন্তু বাঙলার ইতিহাসের প্রাগৈতিহাসিক যুগটা শূন্যই থেকে গেল। ষাটের দশকে বর্তমান লেখক তাঁর ‘হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অভ্ বেঙ্গল’ (১৯৬৩) ও ‘প্রি-হিস্ট্রি অ্যাও বিগিনিংস অভ সিভিলিজেশন ইন বেঙ্গল’ (১৯৬৫) বই দুটি লিথে বাঙলার প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটা ইতিহাস দেবার চেষ্টা করেন।

শুধু তাই নয়, তিনি বাঙলার ইতিহাসকে টেনে আনেন ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় পর্যন্ত। ওই দশকেই রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধিকর্তা পরেশচন্দ্র দাশ গুপ্ত বের করেন তাঁর ‘একসক্যাভেশনস্ অ্যাট পাণ্ডুরাজার ঢিবি’ ও ‘প্রাগৈতিহাসিক বাঙলা’। এর পর (১৯৭১) ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পূর্ণ করেন চার খণ্ডে তাঁর ‘বাঙলার ইতিহাস’। অনেক আগেই প্রকাশিত হয়েছিল

১৯২৯ খ্রীস্টাব্দে ননীগোপাল মজুমদারের ‘ইনস্ক্রিপশনস্ অভ্ বেঙ্গল’, ১৯৪২ খ্রীস্টাব্দে ডঃ বিনয় চন্দ্র সেনের ‘মাম হিস্টরিক্যাল অ্যাসপেকটস্ অভ্র দি ইনস্ক্রিপশনস্ অভ্ বেঙ্গল’ ও ১৯৬৭ খ্রীস্টাব্দে ডঃ রমারঞ্জন মুখার্জি ও এস. কে. মাইতির ‘করপাস অভ্ বেঙ্গল ইনস্ক্রিপশনস্’। আশির দশকে ডঃ দীনেশচন্দ্র সরকার বের করলেন তাঁর ‘শিলালেখ ও তাম্রশাসনাদির প্রসঙ্গ’, ‘পাল-সেন যুগের বংশানুচরিত’, ও ‘পাল-পূর্ব যুগের বংশানুচরিত’। ইদানিং ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, কল্যাণকুমার গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখেরাও আলোকপাত করেছেন বাঙলার ইতিহাসের নানা বিভাগের ওপর।

এদিকে বাঙালীকে সম্যরূপে বুঝবার চেষ্টাও চলতে লাগল। ১৯১৬ খ্রীস্টাব্দে রমাপ্রসাদ চন্দ তাঁর ‘ইত্তো-আরিয়ান রেসেস্’ বইয়ে বাঙালীর দৈহিক গঠনে আপীয় উপাদানের কথা বললেন। এর পনেরো বছর পরে ডঃ বিরজাশঙ্কর গুহ বাঙালীর দৈহিক গঠনে আলপীয় রক্ত ছাড়া, দিনারিক রক্তের কথাও তুললেন। ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ও ক্ষিতীশপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ও এ-বিষয়ে অনুশীলন করলেন। নূতন তথ্যের ভিত্তিতে বাঙালীর প্রকৃত নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের একটা প্রয়োজন অঞ্চভূত হল। এই প্রয়োজন মেটানোর জন্য ১৯৪২ খ্রীস্টাব্দে হিন্দু মহাসভার অনুরোধে বর্তমান লেখক লিখলেন তাঁর ‘বাঙালীর নৃতাত্বিক পরিচয়’ (জিজ্ঞাসা, পুনর্মুদ্রণ ১৯৭৭, ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ )। অপরদিকে সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ব সম্বন্ধে কাজ চালালেন প্রবোধকুমার ভৌমিক প্রমুখ নৃতত্ত্ববিগণ।

মহাস্থানগড়ের সীমানা প্রাচীর
মহাস্থানগড়ের সীমানা প্রাচীর

 

অনেক আগেই বাঙালী সংস্কৃতির সাত-পাঁচের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি রাজ্য পরিভ্রমণ করে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন অবহট্ট ভাষায় ‘সন্ধা’-রীতিতে রচিত লুইপাদের ‘চর্যাচর্য-বিনিশ্চয়’, সরোহবজ্রের ‘দোহাকোষ’ ও কাহ্নপাদের ‘দোহাকোষ’ ও ‘ডাকার্ণব’, এই চার খানা বই আবিষ্কার করা।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্বন্ধে আরও অনেকে অনু শীলন করলেন, যথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দীনেশচন্দ্র সেন, বসস্তরঞ্জন রায় বিশ্ববল্লভ, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, হুকুমার সেন, বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, তমোনাশ দাশগুপ্ত, সজনীকান্ত দাস, প্রবোধচন্দ্র সেন, আশুতোষ ভট্টাচার্য, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, পঞ্চানন চক্রবর্তী, অজিতকুমার ঘোষ, দেবীপদ ভট্টাচার্য, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ভবতোষ দত্ত, নীলরতন সেন, উজ্জ্বলকুমার মজুমদার, ও আরও অনেকে। তাঁদের সকলের অনুশীলনের ফলে, আজ আমরা সম্পূর্ণরূপে পরিচিত হয়েছি বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ, ও বাংলা ছন্দের গতিপ্রকৃতি ও বাংলা সাহিত্যের বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে।

বাঙলা অতি প্রাচীন দেশ। ভূতাত্ত্বিক গঠনের দিক দিয়ে বাঙলাদেশ গঠিত হয়ে গিয়েছিল প্লাওসিন যুগে (প্রায় দশ থেকে পঁচিশ লক্ষ বৎসর পূর্বে )। পৃথিবীতে নরাকার জীবেরও বিবর্তন ঘটে এই প্লাওসিন যুগে। এর পরের যুগকে বলা হয় প্লাইস্টোসিন যুগ। এই যুগেই মানুষের আবির্ভাব ঘটে।

যদিও প্লাইস্টোসিন যুগের মানুষের কোনও নরকঙ্কাল আমরা ভারতে পাইনি, কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষ যে বাঙলাদেশে বাস করে এসেছে, তার প্রমাণ আমরা পাই বাঙলাদেশে পাওয়া তার ব্যবহৃত আয়ুধসমূহ থেকে। এই আয়ুধসমূহের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে প্লাইস্টোসিন যুগের পাথরের তৈরি হাতিয়ার, যা দিয়ে সে যুগের মানুষ আত্মরক্ষা ও পশু শিকার করত, তার মাংস আহারের জন্য। এগুলো পাওয়া গিয়েছে বাকুড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর প্রভৃতি জেলার নানা

স্থান থেকে। এগুলোকে প্রত্ন-প্রস্তর যুগের আয়ুধ বলা হয়। প্রত্নোপলীয় যুগের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল আনুমানিক দশ হাজার বছর আগে। তারপর সূচনা হয় নব-প্রস্তর বা নবোপলীয় যুগের। নবোপলীয় যুগের অবসানের পর, অভ্যুদয় হয় তাম্রাশ্ম যুগের । তাম্রাশ্ম যুগেই সভ্যতার সূচনা হয়। বাঙলায় তাম্রাশ্ম যুগের ব্যাপক বিস্তৃতি ছিল মেদিনীপুর ও বর্ধমান জেলায়। এই যুগের সভ্যতার প্রতীক হচ্ছে সিন্ধুসভ্যতা। বাঙলায় এই সভ্যতার নিদর্শন হচ্ছে পাণ্ডুরাজার ঢিবি।

বাঙলার আদিম অধিবাসীরা ছিল অস্ট্রিক ভাষাভাষী গোষ্ঠীর লোক। নৃতত্ত্বের ভাষায় এদের প্রাকৃ-দ্রাবিড় বা আদি-অস্ত্রাল (Proto-Australoids) বলা হয়। প্রাচীন সাহিত্যে এদের ‘নিষাদ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বাঙলার আদিবাসী দের মধ্যে সাঁওতাল, লোধা প্রভৃতি উপজাতিসমূহ এই গোষ্ঠীর লোক। এছাড়া, হিন্দুসমাজের তথাকথিত ‘অন্ত্যজ’ জাতিসমূহও এই গোষ্ঠীরই বংশধর। বাঙলায় প্রথম অনুপ্রবেশ করে দ্রাবিড়রা। এরা দ্রাবিড় ভাষার লোক ছিল। বৈদিক সাহিত্যে এদের ‘দস্যু’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এদের অনুসরণে আসে আর্থ ভাষাভাষী আপীয়রা (Alpinoids)।

বিহার ধাপ
বিহার ধাপ

 

মনে হয়, এদের একদল এশিয়া মাইনর বা বালুচিস্তান থেকে পশ্চিমসাগরের উপকূল ধরে অগ্রসর হয়ে ক্রমশ সিন্ধু, কাথিয়াবাড়, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কুর্গ, কন্নাদ ও তামিলনাডু প্রদেশে পৌঁছায় এবং তাদেরই আর একদল আরও অগ্রসর হয়ে পূর্ব উপকূল হয়ে বাঙলা ও ওড়িশায় আসে। এরাই মনে হয়, বৈদিক ও বেদোত্তর সাহিত্যে বর্ণিত ‘অস্থর’ জাতি। আরও মনে হয়, এদের সকলেরই সামাজিক সংগঠন কৌমভিত্তিক (tribal) ছিল এবং এই সকল কৌমগোষ্ঠীর (tribes ) নামেই পরে এক একটা জনপদের সৃষ্টি

বৈদিক আর্যরা বাঙলাদেশের অন্তত দুটি কৌমগোষ্ঠীর নামের সঙ্গে পরিচিত ছিল। একটি হচ্ছে ‘বঙ্গ’ যাদের ঐতরেয় ব্রাহ্মণে ‘বয়াংসি’ বা পক্ষীজাতীয় বলা হয়েছে। মনে হয় পক্ষীবিশেষ (“বিহঙ্গ’) তাদের ‘টোটেম’ ছিল। বৈদিক সাহিত্যে দ্বিতীয় যে নামটি আমরা পাই, সেটি হচ্ছে ‘পুণ্ড’। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে তাদের ‘দস্থা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। মনে হয়, তাদের বংশধররা হচ্ছে বর্তমান ‘পোদ’ জাতি।

বৈদিক আর্যরা বাঙলাদেশের লোকদের বিদ্বেষপূর্ণ ঘৃণার চক্ষে দেখত। এটার কারণ দুই বিপরীত সংস্কৃতির সংঘাত। বাঙলায় আর্যদের অনুপ্রবেশের পূর্ব পর্যন্ত, তাদের মনে এই বিদ্বেষ ছিল।

মহাভারতীয় যুগে আমরা বঙ্গ, করট, সুহ্ম, প্রভৃতি জনপদের নাম পাই। মহা ভারতে বলা হয়েছে যে অসুর রাজা বলির ক্ষেত্রজ সন্তানসমূহ থেকেই অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র, ও সুহ্ম জাতিসমূহ উদ্ভূত হয়েছে।

বৌদ্ধ জাতক গ্রন্থসমূহ থেকে আমরা বাঙলার প্রাকৃ-বৌদ্ধযুগের দুটি রাষ্ট্রের নাম পাই। একটি হচ্চে শিবি রাজ্য ও অপরটি হচ্চে চেত রাজ্য। এ দুটি রাষ্ট্র বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পূর্বেই বিদ্যমান ছিল। বর্ধমান জেলার অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ে শিবি রাজ্য গঠিত ছিল। তার রাজধানী ছিল জেতুত্তর নগরে (বর্তমান মঙ্গলকোটের নিকটে ও টলেমি উল্লিখিত সিব্রিয়াম বা শিরপুরী)। এরই দক্ষিণে ছিল চেত রাজ্য। তার রাজধানী ছিল চেতনগরীতে (বর্তমান ঘাটাল মহকুমার অন্তর্ভুক্ত চেতুয়া পরগনা)। এই উভয় রাজ্যেরই সীমান্ত কলিঙ্গ রাজ্যের সীমানার সঙ্গে এক ছিল। কলিঙ্গ রাজ্য তখন বর্তমান মেদিনীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

সিংহল দেশের ‘দীপবংশ’ ও ‘মহাবংশ’ নামে দুটি প্রাচীন গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি যে বঙ্গদেশের বঙ্গ নগরে এক রাজার বিজয়সিংহ নামে এক পুত্র দুর্বিনীত আচারের জন্য সাত শত অনুচরসহ বাঙলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে সিংহলে যায়, এবং সেখানে কুবেণী নাম্নী এক যক্ষিণীকে বিবাহ করে সিংহল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।

আলেকজাণ্ডারের ( ৩২৬ খ্রীস্টপূর্বাব্দ ) ভারত আক্রমণের সময় বাঙলায় ‘গঙ্গারিড’ বা ‘গঙ্গারাঢ়’ নামে এক স্বাধীন রাজ্য ছিল। গঙ্গারাঢ়ীদের শৌর্যবীর্যের কথা শুনেই আলেকজাণ্ডার বিপাশা নদীর তীর থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

এর অনতিকাল পরেই বাঙলা তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। কেননা, মহা স্থানগড়ের এক শিলালিপি থেকে আমরা জানতে পারি যে, উত্তর বাঙলা মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, কারণ মৌর্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্ত ( ৩২২-২১৮ খ্রীস্টপূর্বাব্দ) পুওবধন নগরে এক কর্মচারীকে অধিষ্ঠিত করেন। মনে হয় এই সময় থেকেই আর্যসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বাঙলাদেশে ঘটেছিল। ‘মনুসংহিতা’ রচনাকালে (২০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে ) বাঙলাদেশ আর্যাবর্তের অন্তভুক্ত বলে পরিগণিত হত। কুষাণ সম্রাটগণের ( ৭৮-১০১ ) মুদ্রাও বাঙলার নানা জায়গায় পাওয়া গিয়েছে।

খ্রীস্টীয় চতুর্থ শতকে বাঙলাদেশ গুপ্তসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙলাদেশ আবার স্বাধীনতা লাভ করে। এই সময় ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্র ও সমাচারদের নামে তিনজন স্বাধীন রাজা ‘মহারাজা ধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করেন। গোপচন্দ্র ওড়িশারও এক অংশ অধিকার করেন। এর অনতিকাল পরে বাঙলাদেশের রাজা শশাঙ্ক ( ৬০৬-৬৩৭ ) পশ্চিমে কান্যকুব্জ ও দক্ষিণে গঞ্জাম পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হন। এরপর বাঙলাদেশে কিছু কাল অরাজকতা দেখা দেয়। সামন্তরাজগণ এখানে-সেখানে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন।

গোবিন্দ ভিটা
গোবিন্দ ভিটা

 

এই অরাজকতার হাত থেকে বাঙলাদেশকে রক্ষা করেন পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল (90-99 ) অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে গোপালের সময় (৭৫০-৭৭ ) থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর তৃতীয় পাদে গোবিন্দপালের সময় ( ১১৬১-১১৬৫) পর্যন্ত পালবংশই বাঙলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিল। শেষ পালরাজ পলপাল রাজত্ব করেন ১১৬৫ থেকে ১২০০ পর্যন্ত। একই রাজবংশের ক্রমাগত সাড়ে চারশো বছর ( ৭৫০-১২০ ) রাজত্ব করা ভারতের ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ ঘটনা। গোপালের পৌত্র দেবপাল (৮১০-৮৪৭ ) নিজের রাজ্য বিস্তার করেছিলেন দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্ত। দেবপালের পিতা ধর্মপাল (৭৭০-৮১০) দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে গান্ধার পর্যন্ত সমস্ত উত্তর ভারত জয় করেছিলেন। বস্তুত পালরাজগণের রাজত্বকালই বাঙলার ইতিহাসের গৌরবময় যুগ।

পালবংশের পতনের পর বাঙলায় সেনবংশ রাজত্ব করে। এরাও প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। সেনবংশের তৃতীয় রাজা লক্ষ্মণসেনের আমলেই বাঙলা মুসলমান দের হাতে চলে যায়। এ ঘটনা ঘটেছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীর ( ১২০৪) শুরুতেই। তখন থেকে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম পাদ পর্যন্ত বাঙলাদেশ স্বাধীন সুলতানদের শাসনাধীনে ছিল। পরের পঞ্চাশ বছর (১৫৩১-১৫৭৬) বাঙলা পাঠানদের অধীনে চলে যায়। তারপর ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে সম্রাট আকবরের (১৫৭৬) আমলে বাঙলা মুঘল সাম্রাজাভুক্ত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যাহ্নে (১৭৫৭) বাঙলা মুঘলদের হাত থেকে ইংরেজদের হাতে চলে যায়।

বাঙলার ধর্মীয় সাধনার ও লৌকিক জীবনের আচার-ব্যবহারের একটা বিশদ চিত্র পাঠক পাবেন এই বইয়ে। এখানে কেবল বাঙলার সমাজবিন্যাস ও প্রথাসমূহের একটা রূপরেখা টানবার চেষ্টা করব। আগেই বলেছি যে, বাঙলায় ব্রাহ্মণ্যধর্ম খুব বিলম্বে প্রবেশ করেছিল। সুতরাং ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুপ্রবেশের পূর্বে বাঙলায় চাতুবর্ণা সমাজ-বিন্যাস ছিল না। প্রথমে ছিল কৌমগোষ্ঠিক সমাজ। তারপর যে সমাজের উদ্ভব হয়েছিল, তাতে জাতিভেদ ছিল না, ছিল পদাধিকারঘটিত বৃত্তি ভেদ। এটা আমরা জানতে পারি ‘প্রথম কায়স্ত’, ‘জ্যেষ্ঠ কায়স্থ’, ‘প্রতিবেশ’, ‘কুটুম্ব’ প্রভৃতি নাম থেকে। এসব নাম আমরা পাই সমকালীন তাম্রপটলিপি থেকে।

তারপর পাই বৃত্তিধারী গোষ্ঠীর নাম, যথা—‘নগরশ্রেষ্ঠী’, ‘সার্থবাহ’, ‘ক্ষেত্র কার’, ‘ধ্যাপারী’ ইত্যাদি। পরে পালযুগে যখন রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রাধান্য ঘটে, তখন বাঙলায় বৃত্তিধারী গোষ্ঠীগুলি আর বৈবাহিক আদান প্রদানের সংস্থা হিসাবে স্বীকৃত হয় না। তখনই বাঙলার জাতিসমূহ সঙ্করত্ব প্রাপ্ত হয়। সুতরাং পালরাজগণের পর সেনরাজগণের আমলে যখন ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে তখন বাঙলার সকল জাতিই সঙ্করত্ব দোষে দুষ্ট।

সেজন্য ‘বৃহদ্ধর্মপুরাণ’-এ ব্রাহ্মণ ছাড়া, বাঙলার আর সকল জাতিকেই সঙ্কর জাতি বলে অভিহিত করা হয়েছিল ও তাদের তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছিল—(১) উত্তম সঙ্কর, (২) মধ্যম সঙ্কর ও (৩) অন্ত্যজ। এরপর আর একটা শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছিল ‘নবশাখ’ বিভাগ। নবশাখ মানে যাদের হাতে ব্রাহ্মণরা জল গ্রহণ করত। বিবাহের অন্তর্গোষ্ঠী (endogamous) হিসাবে মধ্যযুগে যে সকল জাতি বিদ্যমান ছিল, তাদের নাম আমরা মঙ্গলকাব্যসমূহে পাই।

কিংবদন্তির জিয়ৎ কুণ্ড বা অমর কূপ
কিংবদন্তির জিয়ৎ কুণ্ড বা অমর কূপ

 

এ সকল জাতি আজও বিদ্যমান আছে। ময়ূরভট্টের ‘ধর্মপুরাণ’-এ যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা এখানে উদ্ধৃত করা হল : “সদগোপ, কৈবর্ত আর গোয়ালা তাম্বুলি / উগ্রপেত্রী কুতকার একাদশ তিলি যোগী ও আশ্বিন তাঁতি মালী মালাকার | নাপিত রজক হলে আর শঙ্খধর/ হাড়ি মুচি ডোম কলু চণ্ডাল প্রভৃতি | মাজি বাগদী মেটে নাহি ভেদজাতি/ স্বর্ণকার সুবর্ণবণিক কর্মকার | সূত্রধর গন্ধবেনে ধীবর পোদ্দার / ক্ষত্রিয় বারুই

বৈদ্য পোদ পাকমারা / পরিল তাম্রের বালা কায়স্থ কেওরা।” (বঙ্গীয়-সাহিত্য পরিষদ সংস্করণ, পৃ. ৮২)

মধ্যযুগের সমাজজীবনকে কলুষিত করেছিল তিনটি অপপ্রথা (১) – কৌলিন্য (২) সহমরণ ও (৩) দাসদাসীর হাট। এসবের বিশদ বিবরণ আমি দিয়েছি এই বই-এ। ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এ সকল প্রথা বাঙালীসমাজে প্রচলিত ছিল। রাজা রামমোহন রায় প্রমুখ সমাজ-সংস্কারকদের প্রচেষ্টার ফলে ইংরেজ সরকার কর্তৃক সহমরণ (১৮২৯) নিবারিত হয়। তারপর বিদ্যাসাগর মহাশয়ের চেষ্টায় বিধবা-বিবাহ আইনসিদ্ধ (১৮৫৬) হয়। পরে অসবর্ণ বিবাহের জন্য ‘বিশেষ আইন’ প্রণয়ন হয় (১৮৭২)। এই আইনেই মেয়েদের ন্যূনতম বিয়ের বয়স করা হয় ১৪। আরও পরে (১৮৯২) বিবাহে সঙ্গমের ন্যূনতম বয়সও বর্ধিত করা হয়। ১৯২৯ খ্রীস্টাব্দে বিবাহের ন্যূনতম বয়সও বাড়ানো হয়। স্বাধীনতা লাভের পর সরকার হিন্দু বিবাহকে সুসংহত করবার জন্য ‘হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট’ (১৯৫৫) প্রণয়ন করেন। এই আইন ও পরবর্তী সংশোধিত আইন দ্বারা ন্যূনতম বিবাহের বয়স ( পাত্রের ২২, পাত্রীর ১৮) বাড়ানো হয়।

 

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!